প্রথমপাতা

ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয় ফরিদপুর শহরের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শহরে এটি ‘হাই স্কুল’ নামেই বেশি পরিচিত। পুরো দক্ষিণবঙ্গের শিক্ষা বিস্তার, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রে অনন্য গৌরবময় অবদান রাখা এই বিদ্যাপীঠটি ১৮৫১ সালে মিড্ল ভার্নাকুলার স্কুল হিসাবে যাত্রা শুরু করলেও যুগের চাহিদা পূরণে ১৮৮৯ সালে মিড্ল ইংলিশ বা এম ই (নিম্ন মাধ্যমিক স্তর) স্কুল এবং এর ধারাবাহিকতায় ১৯৩৪ সালে উচ্চ বিদ্যালয়ে (মাধ্যমিক স্তর) পরিণত হয়। ব্রিটিশ ভারত থেকে সুদীর্ঘ ১৭৫ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের মাঝে গুণগত শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়। পাশাপাশি নদীমাতৃক ফরিদপুরের বুকে প্রগতিশীল চিন্তা এবং আধুনিকতার বীজ বপন করে যাচ্ছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে, পাকিস্তান আমলে ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ – প্রতিটি ধাপে এই বিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভূমিকা গৌরবোজ্বল।

ইতিহাস
১৭৫৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের আমাদের এই বাংলা অংশের স্বাধীন সত্ত্বা হারানোর মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া ব্যবসায়িক কোম্পানিটি উপমহাদেশের শাসন ব্যবস্থার খবরদারিত্ব নিয়ে ফেলে তাদের যেকোনো মূল্যে ব্যবসা বা মুনাফা (সোজা কথায় সম্পদ হাতানো) ভিন্ন অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। ১৮১৩ সালের শিক্ষানীতির আগে এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ইংরেজদের তেমন কোনো চিন্তাও দেখা যায় না। সে সময় এই অঞ্চলে মুসলমানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে মক্তব ও মাদ্রাসা এবং হিন্দুদের জন্য ছিল পাঠশালা। এই দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ, আধুনিক বিজ্ঞান, ইউরোপীয় ইতিহাস বা ভূগোলের মতো বিষয় এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হতো না। ১৮৩৭ সালে লর্ড অকল্যান্ড ফারসির বদলে ইংরেজিকে সরকারি দপ্তরের ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এরই আলোকে ইংরেজ মিশনারিরা বাংলাসহ পুরো উপমহাদেশে পশ্চিমা শিক্ষার মাধ্যমে ‘সভ্যতা’ আনতে চেয়েছিল! তারা স্থানীয় জনগণের উপর তাদের প্রভাব বিস্তারের নীতিতে সেই সময় বিভিন্ন জেলায় সেমিনারি ধরনের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ মাতৃভাষা বা দেশজ স্থানীয় ভাষায় (বাংলা, হিন্দি, উর্দু ইত্যাদি) পাঠদান এবং ইংরেজি মাধ্যম বা বিদেশি ভাষার বিকল্প হিসেবে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে ভার্নাকুলার স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন বাংলার শিক্ষিত সরকারি কর্মকর্তা ও বিদ্যোৎসাহীরা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে এই স্কুলগুলোর ধারণাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরই আলোকে বিদ্যানুরাগীদের সহায়তায় ফরিদপুরের তৎকালীন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ভগবান চন্দ্র বসু ও সেরেস্তাদার চন্দ্র মোহন মৈত্র ১৮৫১ সালে ফরিদপুর শহরের বর্তমান স্টেশন রোডে সম্পূর্ণ বাংলা মাধ্যমের মিড্ল ভার্নাকুলার স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তারা চিন্তা করেছিলেন, ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী সুদূর ইংল্যান্ড থেকে বাঙালি জাতিকে ইংরেজি শিক্ষা চাপিয়ে দিলে বাংলার ছেলে-মেয়েরা মাতৃভাষা বাংলা ভাষায় লেখাপড়া শিখতে পারবে না। এ অনুপ্রেরণায় ভগবান চন্দ্র বসু শুধু ভার্নাকুলার স্কুলটিই প্রতিষ্ঠা করেননি, নিজের ছেলে জগদীশ চন্দ্র বসুকেও (পরবর্তীতে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী) এখানে ভর্তি করেন।

শিক্ষা বিষয়ে ১৮৪৩ সালে লর্ড ম্যাকলে প্রবর্তিত Downward Filtration Theory বা নিম্নগামী পরিস্রবণ নীতি ও ১৮৫৪ সালের উডের ডেসপ্যাচ (Wood’s Despatch) নীতির ফলে মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক লোক পাশ্চাত্য শিক্ষার সুযোগ লাভ করলেও সেই শিক্ষা সুবিধাভোগকারী ওই শ্রেণীর লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইলো। শিক্ষা পরিশ্রুত হয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছার সুযোগ পায়নি। একই সঙ্গে এই নীতি শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করে, যাতে জাতীয় সংহতির পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। দেশি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি শাসকগোষ্ঠীর বিমাতাসূলভ আচরণে দেশের জনশিক্ষায় বিরাট শূন্যতা ও ব্যবধান গড়ে ওঠে। এ নীতি অনুসরণের ফলশ্রুতি হিসেবে ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধে দেশে শিক্ষিতের হার যা ছিল পরবর্তী পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারে সরকারি নীতি গ্রহণ করা সত্ত্বেও বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে নিরক্ষরতার হার আরও বেড়ে গিয়েছিল।

এ সময় সারা দেশেই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক ব্যক্তি স্কুল প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষকতার কাজে এগিয়ে আসতে থাকেন। তাঁদেরই ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ দেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটে। যুগের এই চাহিদা মেটাতে ১৮৮৯ সালে ভার্নাকুলার স্কুলটিকে মিড্ল ইংলিশ স্কুলে উন্নীত করা হয়। ফলে এখানে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষারও সুযোগ হয়। পাশাপাশি প্রাথমিক স্তর থেকে নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন ঘটে। ১৯০২ সালে ফরিদপুরের তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কৃষ্ণ চন্দ্র দে (কে সি দে)- এর মহিয়সী স্ত্রী সরোজিনী দেবী শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ করে বিদ্যালয়ের প্রথম একতলা ভবনটি নির্মাণ করে দেন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ কাজের স্বীকৃতিস্বরুপ ভবনটিতে তার নামফলক স্থাপন করেছেন। পরবর্তীতে রায় বাহাদুর অক্ষয় কুমার সেনের অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৯৩৪ সালে মিড্ল ইংলিশ স্কুলটি ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয় এবং আরও পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী অনুমোদন লাভ করে।

যখন দেশে শিক্ষার ধারণাটিই সুস্পষ্ট হয়নি, তখন সমাজের সব শ্রেণির সন্তানদের মাতৃভাষা বাংলায় পাঠদানে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের গৌরবের পথচলা পৌনে দুইশত বছরের। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয় শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষার আলোই ছড়ায়নি, বরং একটি পশ্চাৎপদ অঞ্চলের সমাজ এবং সার্বিকভাবে দেশের শিক্ষাগত বিকাশ আর সাংস্কৃতিক উন্নতির চলমান ইতিহাস হয়ে আছে।